Tuesday, January 10, 2023

তেল নিয়ে তালেবানের সঙ্গে কেন কোটি কোটি ডলারের চুক্তি চীনের

 


তেল ও গ্যাসক্ষেত্রে উন্নয়নে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৫৪ কোটি ডলারের চুক্তিতে পৌঁছেছে তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তান। ২০২১ সালের আগস্টে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর থেকে এটি প্রথম বড় ধরনের বিনিয়োগ।

কৌশলগত কারণে এগিয়েছে চীন

২০ বছর পর আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হয়। এরপর দেশটির ক্ষমতায় আসে তালেবান। বেইজিং তালেবানকে আফগানিস্তানের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে প্রতিবেশী এই দেশটির বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে ওয়াকিবহাল দেশটি। চীনে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও কৌশলের ক্ষেত্রে আফগানিস্তান এসব কারণে গুরুত্বপূর্ণ।

চীন যখন জ্বালানি নিরাপত্তার মুখোমুখি হয়েছে, তখনই কৌশলগত কারণে তালেবানের সঙ্গে চুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চীন জনবহুল দেশ ও শিল্প জায়ান্ট। দেশটি বিশ্বের জ্বালানি খাতের বড় ক্রেতা।

শিল্পে ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের কারণে বাড়তি চাহিদা মেটানোর মতো অভ্যন্তরীণ সম্পদ নেই চীনের হাতে। এ কারণে চীন তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের অন্যতম প্রধান আমদানিকারক দেশ। রাশিয়া, ইকুয়েডর ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সাম্প্রতিক অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে এটি চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে চীনের দুর্বলতা

এসব দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক তাই এখনো জোরালো। জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে চীনের কৌশলগত দুর্বলতা রয়েছে। রাশিয়া ছাড়া উপসাগরীয় এসব দেশ থেকে সাগরপথে চীনে জ্বালানি আমদানি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিকীকরণের আওতায় থাকা বিরোধপূর্ণ অঞ্চলের ওপর নির্ভর করতে হবে। যেমন বিরোধপূর্ণ দক্ষিণ চীন সাগর।

অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণে তালেবানের সঙ্গে জ্বালানি চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভাবছে চীন
অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণে তালেবানের সঙ্গে জ্বালানি চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভাবছে চীন
রয়টার্স ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্র চীনে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। চীনের সঙ্গে যেকোনো সংঘাতের ক্ষেত্রে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ব্যয়বহুল হলেও যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের অবরোধ আরোপ করে। মালাক্কা প্রণালির মতো কৌশলগত চেকপয়েন্টগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র কৌশল নিয়েছে।

বিআরআইয়ের মাধ্যমে উপায় খুঁজছে চীন

এই দুর্বলতা চিহ্নিত করে গত কয়েক বছরে চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) নিয়েছে। মার্কিন বলয়ের বাইরে গিয়ে আন্তমহাদেশীয় সড়ক, রেলপথ নির্মাণের মাধ্যমে ইউরেশিয়াতে একীভূত করতে চাইছে। এসব পথে চীন থেকে পণ্য আনা-নেওয়ার অবাধ সুযোগ থাকবে।

এর অন্যতম উদাহরণ চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর (সিপিইসি)। বিআরআইয়ের সংযোগ স্থাপক এই করিডর দিয়ে পশ্চিমাঞ্চলের ভারত সাগরে যাওয়ার পথ তৈরি হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার সহজ পথ তৈরি হচ্ছে।

তবে বিআরআইয়ের অন্তর্ভুক্ত কোনো কৌশলগত রোডম্যাপই আফগানিস্তানকে বাদ দিয়ে সম্ভব নয়। মধ্য এশিয়ার দেশটি চীন সীমান্ত, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সংযোগকারী সড়ক হিসেবে অবস্থান করছে।

আরও পড়ুন

তেল উত্তোলনে চীনা কোম্পানির সঙ্গে তালেবানের চুক্তি

তেল উত্তোলনে চীনা কোম্পানির সঙ্গে তালেবানের চুক্তি

লাভ দুই পক্ষের

অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণে চীনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কাবুল। আফগানিস্তানে প্রচুর খনিজ সম্পদ মজুত রয়েছে। ১ লাখ ৭৫ হাজার কোটি কিউবিক ফুট প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানিতে ভরপুর দেশটি। চীনের জন্য এটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে তালেবানের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক দশকে আফগানিস্তানে অর্থ উপার্জনের এমন সুযোগ আসেনি। এসব পরিস্থিতির কারণেই আদর্শগতভাবে ভিন্ন মতাদর্শের দুই দেশ এক হয়েছে।

এই চুক্তির আওতায় আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন। সেই সঙ্গে দেশটির অভ্যন্তরীণ নীতিতে নাক না গলাবে না চীন। তবে এই চুক্তির মধ্য দিয়ে চীনকে তালেবানের উগ্রপন্থী নীতি যেমন নারীদের প্রতি বৈষম্য, শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে নারীদের বঞ্চিত করার মতো বিষয়গুলো উপেক্ষা করতে হবে। যদিও এর আগে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ভাবাদর্শ আফগানিস্তানের ওপর চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে।

চীন বরাবর আফগানিস্তানের ইসলামি মৌলবাদী আদর্শের নিন্দা করেছে। তবে তা সত্ত্বেও চীনের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবসম্মত। জাতীয় ও কৌশলগত স্বার্থে সীমান্তে অবস্থিত তালেবান রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করছে চীন। চীনের চাই অবাধ জ্বালানির প্রবেশ। আর এই জ্বালানির খোঁজের জন্য ভালো জায়গা প্রতিবেশী দেশ ছাড়া অন্য কোথাও হতে পারে না।

বেইজিং মনে করছে, আফগানিস্তানে বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা নিজের দেশকে আর স্থিতিশীল ও উন্নত করতে পারবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে বোমা হামলা ও যুদ্ধ চালিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা হামলায় বিধ্বস্ত হয়েছে আফগানিস্তান। মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযান ও নিষেধাজ্ঞার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশটির অর্থ উপার্জন ও পুনর্বাসনের অধিকার রয়েছে। চীনা বিনিয়োগের ফলে আফগানিস্তানে নতুন, ইতিবাচক ও আলাদা কিছু হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছে তালেবানের প্রতিনিধিদল

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছে তালেবানের প্রতিনিধিদল

শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: